ব্যতিক্রম প্রতিভার এক অনন্য দৃষ্টান্ত: ডিআইজি (অ:) খান সাঈদ হাসান জ্যোতির জীবনপথ
ডিআইজি (অ:) খান সাঈদ হাসান জ্যোতি
বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীর একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র, একটি অনন্য জীবনের উদাহরণ। তিনি যেভাবে প্রতিকূলতা অতিক্রম করে সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছেছেন, তা প্রতিটি প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার।
শৈশব ও প্রারম্ভিক জীবন
ডিআইজি (অ:) খান সাঈদ হাসান জ্যোতি, যিনি উল্লাপাড়ার বড়হর খামারপাড়া গ্রামের মাটির সন্তান, শৈশব থেকেই প্রতিকূলতার সঙ্গে সংগ্রাম করে এসেছেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়, যখন তিনি পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন, তখন পাকবাহিনীর হাতে শহীদ হন তাঁর বাবা, আমজাদ হোসেন খান। বাবার মৃত্যুর পর তিনি তার নানা মরহুম আনোয়ার হোসেন চৌধুরীর বাড়িতে চলে আসেন এবং গ্রামীণ জীবনযাত্রায় নিজেকে মানিয়ে নেন।
যদিও জীবন অনেকটা কঠিন ছিল, তারপরও তিনি পড়াশোনায় অসাধারণ ফলাফল প্রদর্শন করেন। প্রতিবার শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করার দক্ষতা প্রমাণ করে তিনি সিরাজগঞ্জ বিএল স্কুল ও সিরাজগঞ্জ ডিগ্রি কলেজে কৃতিত্বের সাথে শিক্ষা সমাপ্ত করেন। এরপর তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে তিনি গণিতের মতো কঠিন বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন।
পেশাগত উত্থান
স্নাতক সম্পন্ন করার পর ১৯৮৫ সালে ৭ম বিসিএস পরীক্ষায় পুলিশ ক্যাডারে প্রথম স্থান অধিকার করে জাতীয় অঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। পুলিশ বাহিনীতে যোগদানের পর তার যোগ্যতা ও নিষ্ঠার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি পান “বেস্ট অফিসার ট্রফি (সোর্ড অব অনার)” এবং পিপিএম পদক। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও তিনি রেখেছেন অসাধারণ অবদান। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে যোগ দিয়ে যুগোস্লাভিয়ার বসনিয়ায় রিফিউজিতে পরিনত হওয়া মুসলিম জনগোষ্ঠীকে জার্মানি ও ফ্রান্সে পুনর্বাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং অর্জন করেন “জাতিসংঘের বিশেষ পদক।”
দেশে ফিরে একের পর এক সাফল্যের সোপান অতিক্রম করে তিনি উন্নীত হন পুলিশের উচ্চপদে। জীবনের সমস্ত প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে, ত্যাগ, শ্রম ও মেধার সমন্বয়ে তিনি সম্মানের সাথে ডিআইজি পদে ভূষিত হন।
রাজনৈতিক জীবন ও সংগ্রাম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র থাকাকালীন বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হলে বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাকালীন ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। এর ফলে তাঁর নেতৃত্বের গুণ ও সাহসী মানসিকতার প্রকাশ ঘটে। রাজনীতির মহাসাগরে পরিস্থিতির নির্মম খেলায় অনেক সৎ, দেশপ্রেমিক ও নিষ্ঠাবান মানুকে মূল্য দিতে হয়েছে। জনাব জ্যোতি তাদের মধ্যে দৃষ্টান্ত সৃষ্টিকারী উদাহরণ। শহীদ জিয়ার আদর্শের রাজনীতিকে ভালোবাসার অপরাধে তার জীবনে নেমে আসে কালো মেঘের ছায়া। ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের মিশনে Humanitarian Officer হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই গুণী মানুষটিকে ২০০৯ সালে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী সরকার অন্যায়ভাবে সরকারি চাকরি থেকে অপসারণ করে ওএসডি করে দেয়।
একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় তারেক রহমানের বিরুদ্ধে সাজানো মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে অস্বীকার করায় তাকেও ওই মামলায় আসামি করা হয়। এমনকি পরিকল্পনা ছিল তাকে গুম কিংবা ক্রসফায়ারে হত্যা করার। ফলে দীর্ঘ সাড়ে আট বছর তিনি আত্মগোপনে জীবন কাটান।
সত্যবাদী ও আল্লাহভীরু এই মানুষটি ২০১৯ সালে আদালতে আত্মসমর্পণ করেন এবং অবশেষে ২০২২ সালে মুক্তি পান। কিন্তু মুক্ত জীবনও তার জন্য পুরোপুরি মুক্ত ছিল না— গোয়েন্দা নজরদারির কারণে তার চলাফেরা ছিল সীমিত। অবশেষে ২০২৪ সালে স্বৈরাচারের পতনের পর তিনি আবার মুক্তভাবে চলাফেরার সুযোগ পান। বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে বিএনপির সকল আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থেকে দেশ ও জাতির কল্যাণে নিজের অবদান রেখে চলেছেন।
পারিবারিক জীবন
ব্যক্তিজীবনে জনাব জ্যোতি দুই ছেলে ও এক মেয়ের সফল সন্তানদের গর্বিত পিতা। তাঁর বড় পুত্র-দম্পতি ডাক্তার, তারা অস্ট্রেলিয়ায় কর্মরত। কন্যা-দম্পতি ইঞ্জিনিয়ার, তারা সিঙ্গাপুরে কর্মরত। অবিবাহিত অপরপুত্র ব্যারিস্টার, ঢাকা হাইকোর্টের প্র্যাকটিস করেন। তিনি নিয়মিত সপ্তাহে দুই দিন রোজা রাখেন এবং বারো বছর বয়স থেকেই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে আসছেন।
ভবিষ্যতের প্রত্যাশা
ডিআইজি (অ:) খান সাঈদ হাসান জ্যোতির জীবনী শুধু তার একক সাফল্যের কাহিনী নয়; এটি একটি অনুপ্রেরণার ইতিহাস। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, দৃঢ় সংকল্প ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে যে কোনো ব্যক্তি আকাশের চেয়েও উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।
আমরা আশা করি, তার নাগরিক সমাজ ও সরকারের উন্নয়নে অবদান রাখার ক্ষেত্রে আরও অসাধারণ মাইলফলক অতিক্রম করবেন এবং দেশের জনগণের জন্য একটি উদাহরণ স্থাপন করবেন। তার জীবনের আগামী দিনগুলো আরও সুন্দর ও সাফল্যের গল্প নিয়ে আসুক এবং দেশের মানুষ তাকে ভালবাসার সাথে স্মরণ করুক।
আল্লাহ তাকে সুস্থ রাখুন এবং দীর্ঘ হায়াত দান করুন।